নিউমার্কেট এলাকা রণক্ষেত্র : নিহত ১, আহত অর্ধশতাধিক, দিনভর সংঘর্ষের দায় কার

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ   20 April 2022

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা ব্যবসায়ী-দোকান কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল মঙ্গলবার। এদিন সকাল থেকে দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

এর আগের দিন রাতে দুটি খাবার দোকানের কর্মীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার জেরে জড়িয়ে পড়েন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এর জের ধরে সোমবার মধ্যরাতেও হয়েছিল টানা প্রায় তিন ঘণ্টার সংঘর্ষ।

সেহরি সময় (রাত ৩টা) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর সকাল ১০টা পর্যন্ত গোটা এলাকা ছিল মানবশূন্য ভূতুড়ে পরিবেশ। কিন্তু ওঠাৎ করে দুপক্ষের ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, টায়ারে অগ্নিসংযোগ, লাঠি-রড হাতে ধাওয়া-পালটাধাওয়া এবং পুলিশের টিয়ারশেল নিক্ষেপে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সংঘর্ষে আহত কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান নাহিদ হাসান (২০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মারা যান। এছাড়া নয়জন গণমাধ্যমকর্মীসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আর মঙ্গলবার (গতকাল) বিকালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বলা হয়েছে। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষার্থীরা। সোমবার রাতে পুলিশ সঠিক সময়ে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও মঙ্গলবার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অনেক দেরিতে।

এ কারণে পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তাদের প্রশ্ন-রাতের এই সংঘর্ষ পরের দিন (মঙ্গলবার) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়াল কেন?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতা অথবা ঢাকা কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ ঘটনা দ্রুত থামাতে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিলেন না কেন?

রমজানের মধ্যে প্রচণ্ড গরম, সংঘর্ষে সৃষ্ট অসহনীয় যানজট মাড়িয়ে রাস্তায় বের হয়েছিলেন অসংখ্য মানুষ। অনেকে এসেছিলেন আসন্ন ঈদুল ফিতরের কেনাকাটা করতে। দীঘস্থায়ী সংঘর্ষে রাস্তাঘাট বন্ধ থাকায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

শুধু তাই নয়, প্রায় দুই বছর করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরাও ঈদ সামনে রেখে বেচাকেনা নিয়ে মহাব্যস্ত ছিলেন। এ সময় একেবারেই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন সংঘর্ষের ঘটনাটিকে নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। পুরো ঘটনার নির্মোহ অনুসন্ধান চালিয়ে এর দায় কার-তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ীদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। এদিকে দুপুরের পর থেকে নিউমার্কেট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন ইডেন ও বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থীরা।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের চাঁদাবাজি, ফাও খাওয়া বা কম মূল্য পরিশোধ নয়, বরং নিউমার্কেটের দুটি ফাস্টফুড দোকানের কর্মচারীদের বিবাদ থেকেই সংঘাতের শুরু। এই বিবাদে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে শায়েস্তা করতে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের ডেকে আনে। সেই সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমের হাতে।

সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিউমার্কেটের-৪ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকতেই ‘ওয়েলকাম’ ও ‘ক্যাপিটাল’ নামের দুটি ফাস্টফুডের দোকান। ইফতারের সময় হাঁটার রাস্তায় টেবিল বসিয়ে ইফতারসামগ্রী বিক্রি করতে বসাকে কেন্দ্র করে ওই দুই দোকানের কর্মীদের হাতাহাতি হয়।

বিতণ্ডার একপর্যায়ে ক্যাপিটালের কর্মচারী কাওসারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন ওয়েলকাম ফাস্টফুডের কর্মচারী বাপ্পী। এরপর রাত ১১টার দিকে বাপ্পীর সমর্থক ১০-১২ জন যুবক আসে নিউমার্কেটে। এ সময় তারা হাতে রামদা নিয়ে আসে। তারা ক্যাপিটাল দোকানে গিয়ে কাওসারের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ায়।

সেখানে কাওসার সমর্থকরা বাপ্পীর সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়ে মার্কেট থেকে বের করে দেয়। বাপ্পী সমর্থকরা মার্কেট থেকে পালিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি দল নিয়ে এসে মার্কেটে হামলা চালায়।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, সোমবার রাত ১১টা ৩ মিনিটে ৪ নম্বর গেট দিয়ে রামদা হাতে সাদা টি-শার্ট পরা এক তরুণের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল মার্কেটে প্রবেশ করে। এরপর তারা ওয়েলকাম ফাস্টফুডে ঢুকে সেখান থেকে বেরিয়ে ক্যাপিটাল ফাস্টফুডের দিকে যায়।

সেখানে দোকানের বাইরেই ঝামেলা শুরু হয়। এর কিছুক্ষণ পর মার খেয়ে পালিয়ে যায় বহিরাগত তরুণরা। তারা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই তড়িঘড়ি ক্যাপিটাল দোকানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিপদ আঁচ করতে পেরে সে সময় মার্কেটের ৪ নম্বর গেট বন্ধ করে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে হেলমেটধারী কলেজ ছাত্ররা এসে ৪ নম্বর গেট ভাঙতে শুরু করে। রাত ১২টার দিকে ছাত্ররা ২ নম্বর গেট খুলে মার্কেটে ঢুকে কিছুক্ষণ ভাঙচুর করে আবার বেরিয়ে যায়। এ সময় তাদের দুটি দোকান ভাঙচুর করতে দেখা যায়। তখন থেকে ব্যবসায়ীসহ হকাররা ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

ঢাকা নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, দুটি দোকানের ব্যবসায়ী কর্মচারীদের মধ্যে ঝগড়া হয়।

এক দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে ঢাকা কলেজের কিছু শিক্ষার্থীর বন্ধুত্ব। সে তার বন্ধুদের খবর দিয়ে নিয়ে আসে। তারপর এদের সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার একপর্যায়ে তারা ঢাকা কলেজে ফেরত গিয়ে বলে- আমাদেরকে মেরেছে।

কলেজ ও হল বন্ধ : দিনভর সংঘর্ষের মধ্যে ঢাকা কলেজ বন্ধ ও হল খালি করার ঘোষণা দিয়ে তোপের মুখে পড়া অধ্যক্ষ এটিএম মইনূল হোসেন ছাত্রদের ‘হলে থাকতে দেওয়ার আশ্বাস’ দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন।

ক্যাম্পাস থেকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বেরিয়ে তিনি পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেনকে দেখতে যান। কলেজের ব্যবস্থাপনা চতুর্থ বর্ষের এ ছাত্র ওই হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন।

কলেজ ও হল বন্ধের ঘোষণা আসার পর মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৩টা থেকে ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কার্যালয় ঘিরে রাখেন তারা।

পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে হলে থাকার আশ্বাস দেওয়ার পর অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে সড়ে যান শিক্ষার্থীরা। এরপর অধ্যক্ষ মইনূল কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। অধ্যক্ষ যখন ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন তখনও ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস এবং নিউমার্কেট এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল।

এরআগে ৫ মে পর্যন্ত ঢাকা কলেজের সব হল বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার বিকালের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বলা হয়। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক এটিএম মইনূল হোসেনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ থেকে ৫ মে (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত ঢাকা কলেজের হলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলো।

এছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে (মঙ্গলবার) বিকালের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

দিনভর সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনে থেকে উঠে শিক্ষার্থীরা কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে চলে যান। এ সময় ঢাকা কলেজের মূল ফটক আটকে দেওয়া হয়। এর আগে রাত সোয়া ১০টার দিকে দোকান মালিক ও কর্মচারীরা সড়ক ছেড়ে চলে যান।

এদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষের হল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীদের প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল সম্রাট বলেন, কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। কাল (বুধবার) সকাল ১১টায় আমরা নীলক্ষেতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করব।

নিউমার্কেট জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহেন শাহ জানান, সোমবার মধ্যরাতে নিউমার্কেট এলাকায় একটি খাবারের দোকানে ‘দাম দেওয়া-নেওয়া নিয়ে’ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রাতে ঢাকা কলেজের একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়।

এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মধ্যরাতের সংঘাতের পর থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার সকালে আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন নিউমার্কেটের দোকান-কর্মচারী এবং ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে অন্তত ৪০ জন আহত হন।

রাতের সংঘর্ষের সময় আহতদের মধ্যে দুই শিক্ষার্থীসহ চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মোশাররফ হোসেন নামে ম্যানেজমেন্ট চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীকে স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে রাখা হয়েছে জানিয়ে উপকমিশনার শাহেন শাহ বলেন, তার অবস্থা এখন ‘স্থিতিশীল’। তিনি বলেন, নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন। আমরা দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।

পুলিশ জানায়, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা রাতের ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মানববন্ধন করতে রাস্তায় জড়ো হন। এ সময় ব্যবসায়ীরা বেরিয়ে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

কলেজের সামনের সড়কে লাঠি, রড হাতে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের ঢিল ছুড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে আনারকলি মার্কেট এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকা দোকান-কর্মচারীরা পালটা জবাব দেন।

সংঘর্ষের ঘটনায় মঙ্গলবার যাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয় তাদের মধ্যে আছেন কাজী সুমন (২৫), কবির (৩৮), সাজ্জাদ (৪৫), সাগর (১৮), আপেল (৩৫), রাজু (১৬), রাসেল (১৪), রাহাত (১৮), অলিফ (২২), মহিউদ্দিন (২৬), রুবেল (২৫), আরাফাত জামান (১৮), ইয়াসিন (১৭), নাজমুল (২০), রায়হান (১৭), রাসেল (২৬), হৃদয় (১৮), মেহেদী (১৮), রিমা (২০), মুন্না (২২), নাসির (২৪), আকাশ (২২) প্রমুখ।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় দুপুর পর্যন্ত আমাদের এখানে ৪০ জন আহত ব্যক্তি এসেছেন। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

এই দুজনসহ চারজনকে ভর্তি রেখে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রেসপন্স টিম তৈরি করে অন্য আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যাদের ভর্তি রাখা হয়েছে তারা হলেন দোকান কর্মচারী মোরসালিন, ইয়াসিন, অজ্ঞাত পুরুষ (২৫) ও শিক্ষার্থী কানন চৌধুরী। আহত কানন ঢাকা কলেজ দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দোকান-কর্মচারী মোরসালিনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকন্দিতে।

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে হাজার হাজার দোকান-কর্মচারী লাঠি আর ইট নিয়ে রাস্তায় অবস্থান করছিল। আর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের অবস্থান ছিল কলেজ ফটকের সামনে এবং হলের ছাদে।

রাস্তায় অনেকের হাতে লাঠি আর মাথায় হেলমেট দেখা গেছে। ঢিল বৃষ্টির মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল ছুড়েছে পুলিশ। কয়েকটি বিস্ফোরণের আওয়াজও পাওয়া যায়।

আগের রাতের সংঘর্ষের পর থেকেই সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। সকালে সংঘর্ষ শুরুর পর রাস্তায় কাঠসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র জড়ো করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, সব পক্ষকে শান্ত করে রাত ৪টার দিকে আমরা বাসায় ফিরেছিলাম। আমরা ছাত্রনেতাদের কথা দিয়েছিলাম যে, ব্যবসায়ীরা আর সংঘর্ষে জড়াবে না। কিন্তু সকালে ছাত্ররা আবার সড়ক অবরোধ করে। ফলে পাশে চাঁদনী চক, গাউছিয়া ও অন্যান্য মার্কেটের ব্যবসায়ীরা আবার একত্রিত হয়ে সংঘর্ষে জড়ায়।

এদিকে এই ঘটনার জের ধরে সেই এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নিউমার্কেট মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য রাজ্জাক জানান, মূল সড়ক বন্ধ থাকায় যানবাহনকে ঘুরে যেতে হচ্ছে। তাতে আশপাশের সব সড়কে চাপ পড়ছে। নীলক্ষেতের দিকে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে।

নিউমার্কেট দোকান মালিক সমিতির নেতা শাহীন আহমেদ বলেন, নিউমার্কেটের ৪ নম্বর গেটের কাছে একটি খাবারের দোকান থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। ওই খাবারের দোকানের লোকজনের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বাগ্বিতণ্ডার পর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। রাতে ছাত্ররা অগ্নিসংযোগেরও চেষ্টা করে, কয়েকটি দোকানে লুটতরাজ চালায়।

সাংবাদিক আহত : রাজধানীর নিউমার্কেটে ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ৯ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ইটের আঘাতে জখম হয়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়েছে হেলমেটধারীরা।

সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকা পোস্টের সিনিয়র রিপোর্টার জসীম উদ্দীন মাহির চোখে এবং মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ইকলাচুর রহমান হাতে আঘাত পেয়েছেন।

এছাড়া হেলমেটধারীরা দৈনিক আজকের পত্রিকার রিপোর্টার আল আমিন রাজু ও ডেইলি স্টারের ফটোগ্রাফার প্রবীর দাসকে পিটিয়েছে। দীপ্ত টিভির রিপোর্টার আসিফ সুমিত, এসএ টিভির রিপোর্টার তুহিন, ক্যামেরাপারসন কবির হোসেন, আরটিভির ক্যামেরাপারসন সুমন দে, মাই টিভির রিপোর্টার ড্যানি ড্রং ইট-পাটকেল ও হকিস্টিকের আঘাতে আহত হয়েছেন।

এদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বিএফইউজের সভাপতি ওমর ফারুক ও মহাসচিব দীপ আজাদ এবং ডিইউজের সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন এক বিবৃতিতে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ইডেন ও বাঙলা কলেজ শিক্ষার্থীদের মিছিল : নিউমার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভ-মিছিল করেছেন বাঙলা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার বিকালে বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে এসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা নীলক্ষেত মোড়ে জড়ো হন। এ সময় তারা উই ওয়ান্ট জাস্টিস, ঢাকা কলেজে হামলা কেন ইত্যাদি স্লোগান দেন।

মিছিল নিয়ে নিউমার্কেটের দিকে এগিয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ধাওয়া দেন ছাত্রীদের। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে পিছু হটেন ব্যবসায়ীরা।

ইডেন কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্রী ঐশ্বর্য মন্ডল বলেন, নিউমার্কেটে কিছু কিনতে গেলে ব্যবসায়ীরা আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। যে কোনো বিপদে ঢাকা কলেজের ভাইয়েরা আমাদের জন্য এগিয়ে আসেন। তাই আজ তাদের বিপদেও আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি। আমরা এ হামলার বিচার চাই।

মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ : ব্যবসায়ী ও ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের মধ্যে নিউমার্কেট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওই কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার বিকাল থেকে সরকারি নির্দেশে নিউমার্কেট এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এদিকে ফিক্সড ইন্টারনেট (আইএসপি) সেবা যথারীতি চালু আছে বলে জানিয়েছেন আইএসপিএবির সভাপতি ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধের কোনো সরকারি নির্দেশনা এখনো আমরা পাইনি।

তোপের মুখে পড়লেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক : সংঘর্ষ থামাতে এসে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে একটি কালো নোহা মাইক্রোবাসে ঢাকা কলেজে আসেন তিনি।

কলেজের ভেতরে পুকুর ঘাটে গাড়ি থেকে নামার পরপরই তাকে ঘিরে ধরেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ সময় লেখকের সামনেই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

এক শিক্ষার্থী লেখককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি তামাশা দেখতে আসছেন।’ তার কথা শেষ না হতেই আরেকজন বলেন, ‘কেন আসছেন এখানে? সারা জীবন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে আমরা বাঁচালাম। রাত থেকে ঝামেলা চলছে, অথচ আপনাদের কেউ আসলেন না।’

তবে এসবের জবাবে কিছু বলেননি লেখক। এ সময় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি না হওয়ার জন্যও লেখকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কলেজ শাখার নেতাকর্মীদের দাবি, কলেজের ছাত্রলীগের কমিটি থাকলে ব্যবসায়ীরা এত সাহস পেত না।

এ সময় জবাবে লেখক বলেন, ‘কমিটি দিলে তো রাখতে পারো না। কমিটি থাকলে আজকে যে দুজন দায়িত্বে থাকত, তাদের তো বহিষ্কার করতে হতো।’

এদিকে লেখকের পর ঢাকা কলেজে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে যান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে এসে ছাত্রলীগ সভাপতি জানান, আমরা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। তবে আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে, এর নিশ্চয়তা চেয়েছে শিক্ষার্থীরা।

ঢাবির শিক্ষার্থীদের সংহতি : দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও গণতন্ত্রের তোরণ গেটের সামনে অবস্থান নেয় একদল শিক্ষার্থী। এখানে উপস্থিত সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সংসদের সাবেক ভিপি এমএম কামাল উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আমাদের ভাই। আজকে আমাদের ভাইদের ওপর নির্মমভাবে হামলা করা হয়েছে তাই এর প্রতিবাদ জানাতে এখানে অবস্থান নিয়েছি।

দেশের খবর

আপনার মতামত লিখুন :