মিথ্যাচারে ভরপুর আল জাজিরার প্রতিবেদন

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ   09 February 2021

নিউজ ডেস্ক:
সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিয়ে করা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন নিয়ে চলছে সর্বমহলে সমালোচনা। বলা হচ্ছে, আল-জাজিরার অনুসন্ধান টিম বাংলাদেশ সরকার নিয়ে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য বের করেছে। কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিবেদনটির কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণেই সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। সমালোচিত আল-জাজিরার প্রামাণ্যচিত্রটির নাম দেওয়া আছে অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার্স ম্যান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটি বলার চেষ্টা করেছে, তাদের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তারা বাংলাদেশের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। গণমাধ্যমটি দাবি করছে তাদের প্রামাণ্যচিত্রে এমন কিছু উঠে এসেছে যা আগে বাংলাদেশের মানুষ জানতো না।

এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিভুরঞ্জন সরকার বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটি একটু গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে, এর পরতে পরতে অসঙ্গতি, বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচার লুকায়িত রয়েছে। কারণ প্রামাণ্যচিত্রটিতে বার বার দুর্নীতির কথা বলা হলেও এত বিপুল পরিমাণ দুর্নীতির টাকা কোথা থেকে আসলো আর তা কীভাবে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হলো তা স্পষ্ট হয়নি। বরং উল্টো এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখলেই মনে হবে, কাউকে টার্গেট করে চরিত্র হননের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। বরং এই প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করতে যে বিপুল টাকার খরচ হয়েছে তার উৎস নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

বিভুরঞ্জন সরকার আরো বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটিতে কোথাও দেখানো হয়নি বাংলাদেশের দুর্নীতি কোথায় হয়েছে কিভাবে হয়েছে। কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেখে লেনদেন হয়েছে। কিচ্ছু দেখানো হয়নি। দুর্নীতি হলে অবশ্যই কোনো ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেন তো হবার কথা যেখানে অস্বাভাবিকভাবে টাকা ঢুকেছে এমন কিছু তো হবার কথা। তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে আল জাজিরা। বরং প্রামাণ্যচিত্রটিতে কোন ব্যক্তি পর্যন্ত নেই যিনি বলেছেন যে, হারিস আহমেদ সংশ্লিষ্ট ঘুষ দিয়েছেন বা ঘুষ নিয়েছেন।

এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুভাষ সিংহ এই প্রতিবেদককে বলেন, আল জাজিরার রিপোর্টে সেনাপ্রধানের বিদেশে গমন করার পর ভাইদের সাথে দেখা করার বিষয়টির স্বপক্ষে কোন প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি। কিছু ফুটেজ কাটিং করে দেখানো হয়েছে যা ভিত্তিহীন। এছাড়াও একটু ভালো করে খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, দেশের বাইরে সেনাপ্রধান এবং তার ভাইদের একসাথে থাকার কোন ছবি কিংবা ভিডিও দেখানো হয়নি। এর থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়।

সুভাষ সিংহ বাংলা নিউজ ব্যাংককে আরো বলেন, আল জাজিরার তথাকথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সাংবাদিকতার সর্বনিম্ন স্তরের একটি। যেখানে সাংবাদিকতাকে কলঙ্কিত করা হয়েছে নাটকীয়তা সৃষ্টি করার মাধ্যমে। বেশ কিছু অসঙ্গতি, বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে ছিল। মজার বিষয় হলো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সাইকোপ্যাথ কিভাবে তথ্যের উৎস হলো তার সঠিক উত্তর আল জাজিরা দিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। এক ঘণ্টার এই প্রতিবেদনে দুর্নীতির সাক্ষী হলেন একজন সাইকোপ্যাথ! এটা অবাক করার মতো একটি বিষয়। যেখানে প্রতিবেদনের শুরুতে-ই দুর্নীতির সাক্ষীকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে একজন সাইকোপ্যাথ হিসেবে। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কথাতেই এত দেশ ঘুরে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে আল জাজিরা এটা ভাবতেই আমার অবাক লাগে।

এদিকে কী উদ্দেশ্য ছিল আল জাজিরার এমন প্রশ্ন রাখছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাসনিম খলিল, ডেভিড বার্গম্যানের মতো বিতর্কিত লোকের সাক্ষাতকার কেন এই প্রামাণ্যচিত্রে ? এই প্রশ্নও তাদের।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশিস ঘোষ বলেন, এটিকে আমি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলতে নারাজ। আমার মনে হয় এই প্রতিবেদনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের লবিস্ট ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডেভিড বার্গম্যানের উপস্থিতির মাধ্যমে। এটি তখনই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে তার ভিউয়ারসদের কাছে।

আশিস ঘোষ বলেন, পুরো প্রতিবেদনে অভিযোগকারী হলো সামি নামে এক ব্যক্তি। সামির চেহারাও দেখানো হয়েছে এখানে। এমনকি হারিসের ব্যবসায়ীক পার্টনার হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে তাকে। কিন্তু তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সামিকে দিয়ে এই প্রতিবেদনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে অথচ তার পুরো নাম পরবর্তীতে বেরিয়ে এলো তানভীর মোঃ সামিউল আলম। আবার আরো কয়েকটি নাম বেরিয়ে এলো। সে বাংলাদেশে প্রতারণা করে একবার র‌্যাবের হাতে ধরাও পড়েছিল। আপনি একজন প্রতারকের কাছ থেকে সত্য পাবেন না এটাই বাস্তবতা।

আশিস ঘোষ বলেন, এখন দেখার বিষয় দুর্নীতি হলে এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়নি কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, কিভাবে হয়েছে কে বা কারা দুর্নীতি করেছে। কে টাকা দিলো কেইবা টাকা পেল। বলা হয়েছে নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা দিয়েছে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তাহলে টাকা কে দিলো, কাকে টাকা দিলো এসব কিন্তু প্রতিবেদনে নেই। মিথ্যাচারে ভরপুর একটি প্রতিবেদনে আসলে এত বিস্তারিত দেয়ার মতো অ্যালিমেন্ট থাকে না। আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, কেবল কিছু কাল্পনিক কথা কিছু লোকের মুখ দিয়ে বলানো হয়েছে। বিভিন্ন বিভ্রান্তমূলক কথা বলানো হয়েছে। ব্যাংক একাউন্টের হদিস নেই অথচ দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি খুবই হাস্যকর। মিথ্যাচারের প্রতিবেদনটিতে দুর্নীতির কোন তথ্য-উপাত্ত একদমই নেই। শুধু মিথ্যাচার দিয়েই কাল্পনিক চরিত্র দিয়েই একজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। যা খুবই অনভিপ্রেত।

আন্তর্জাতিক এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আলজাজিরা খুব কৌশলে একটি বিষয় এড়িয়ে গেছে। সেটা হলো সেনাপ্রধানের তিন ভাই যাকে খুন করার অভিযোগে অপরাধী সেখানে বলা হচ্ছে। সেই ব্যক্তি মৃত্যুর আগে নাকি বলেছেন হারিসের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো সেই ব্যক্তি কীভাবে জানলো হারিসের পিস্তলটি লাইসেন্স করা। হারিস কী গুলি করার আগে তাকে নিজের পিস্তলটি লাইসেন্স করা বলেছিল? সেটা কী বিশ্বাসযোগ্য ? আলজাজিরা একটি কথা উল্লেখ-ই করেনি যে, যাকে খুন করা হয়েছে বলা হচ্ছে সে নিজেও কিন্তু একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিল।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশিস ঘোষ বলেন, আল-জাজিরার ডিএইচএল কুরিয়ারে চিঠি আসার বিষয়ে কিছু দেখানো হয়েছে। যা প্রমাণ হিসেবে তেমন শক্ত না। ডিএইচএল এর একটি কাগজ বানানোও সম্ভব। সেনাপ্রধানের কাছে চিঠি পাঠানোর ঘটনাটি প্রমাণ করার বিষয়টি খুবই দুর্বল প্রকৃতির ছিল। কোন অনুসন্ধানে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে তার সাক্ষাৎকার থাকা অথবা নেয়ার চেষ্টা করা বাধ্যতামূলক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে। এখানে কোন সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টাও করা হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়। বরং এখানে একচেটিয়া সরকারের নির্বাচন থেকে শুরু করে অনেক বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবেদনটি কতটা নিরপেক্ষভাবে তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ করার অবকাশ রয়েছে। সামি চরিত্রটি যেখানে বিরোধী গ্রুপের সেই হাওয়া ভবনের পরিচিত মুখ ছিল। যা এখন প্রকাশ পেয়ে গেছে। তখন বোঝায় যায়, দুর্নীতির দায়ে তালিকাভুক্ত একজন অপরাধীকে দিয়ে আল-জাজিরার এই নাটকটির পেছনে ভিন্ন একটি চক্রান্ত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :