বঙ্গবন্ধু টানেলে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার


admin প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২২, ২০২৩, ৯:২৮ পূর্বাহ্ন | 415
বঙ্গবন্ধু টানেলে খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার

উদ্বোধনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে দক্ষিণ এশিয়ার নদীর তলদেশের প্রথম টানেল ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে যান চলাচলের এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ঘষামাজা। সব ঠিক থাকলে ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু টানেল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করবেন।

বঙ্গবন্ধু টানেলকে মনে করা হচ্ছে পদ্মা সেতুর পর দেশের যোগাযোগ খাতের দ্বিতীয় বিপ্লব। এ টানেলের কারণে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। টানেল দিয়ে দেশের নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালীর অর্থনৈতিক হাব, বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক জোনসহ পুরো দেশের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজতর হবে। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বিকশিত হবে পর্যটনশিল্প। বাড়বে বিদেশি বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদদের মতে, টানেল চালু হওয়ার কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম মনে করেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল অত্যন্ত দূরদর্শী একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পের কারণে চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।’ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেলের সার্বিক কাজ বলতে গেলে শেষ পর্যায়ে। টানেলের কাজের অগ্রগতি নিয়মিত পরিদর্শন করে তদারক করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে সেতু বিভাগের সচিব এসে টানেল পরিদর্শন করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী টানেল উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে আমাদের প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে অতিথিদের দাওয়াত দিতে একটি খসড়া তালিকাও তৈরি করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে চূড়ান্ত করা হবে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালু হলে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়বে ব্যাপক হারে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। টানেলের কারণে পর্যটন নগরী কক্সবাজার, পার্বত্য জেলা বান্দরবান এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে পুরো দেশের সেতুবন্ধ তৈরি হবে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, এলপিজি টার্মিনাল, অয়েল টার্মিনাল, গ্যাস ট্রান্সমিশন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, অয়েল রিফাইনারি, এনার্জি ও ফুড স্টোরেজ, ট্যুরিজম, এমব্যাঙ্কমেন্ট ও ওয়াটারফ্রন্ট ইকোনমিক জোনের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। আনোয়ারা উপজেলায় গড়ে ওঠা কোরিয়ান ইপিজেড, চায়না ইপিজেড, সিইপিজেডে আরও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সাশ্রয় হবে সময় ও অর্থ। টানেলের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পর্যটনশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশে এটি ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। বাড়বে রপ্তানি।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, টানেল এক যান চলাচলের জন্য পুরো প্রস্তুত। ফায়ার সার্ভিস ও থানা ভবনসহ অন্যান্য সার্ভিস ভবনের কাজ চলমান। টানেলের দুই প্রবেশমুখে বসানো হচ্ছে চারটি করে আটটি স্ক্যানার, যা আগামী কয়েক দিনে শেষ হবে। এরই মধ্যে টোল নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ১২ ধরনের গাড়িতে সর্বনিম্ন টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা। চার এক্সেলের গাড়ির জন্য ১ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি এক্সেলের জন্য ২০০ টাকা বাড়তি টোল দিতে হবে। বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হওয়ার পর শিল্প-কারখানার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হবে, যা জিডিপিতে বড় অবদান রাখবে। এতে করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবে।’

প্রসঙ্গত, চীনের সাংহাইয়ের ওয়ান সিটি টু টাউনের আদলে চট্টগ্রাম শহর ও আনোয়ারাকে একসূত্রে যুক্ত করতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে তৈরি হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। টানেল পুরোদমে চালু হলে প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি চলাচল করবে। বছরে সে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৩ লাখ। ২০২৫ সালে টানেল দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে, যার মধ্যে অর্ধেক থাকবে পণ্যবাহী যান। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০৬৭ সাল নাগাদ ১ লাখ ৬২ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে।