ভোটের পরে জোটে ‘জ্বালা’

 admin
প্রকাশিত :  29-01-2019

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে চাপে ফেলতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও এবার মহাজোটের আকার কিছুটা বাড়িয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু ভোটে ‘ভূমিধস’ বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে এবং ভূমিধস পরাজয়ের পর বিএনপির দুই জোটের মধ্যে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত কোনো প্রভাবই কাজে লাগাতে পারেনি বিএনপি। উল্টো জোটের শরিক গণফোরামের নির্বাচিত দুই সদস্যের আচরণ জোটে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি করছে। আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর মন্ত্রিসভায় জোটসঙ্গীদের না রাখার কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মহাজোটেও চলছে স্থবিরতা।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসনে জয়লাভ করে। এ কারণে আওয়ামী লীগের ওপর জোটের শরিকদের কোনো প্রভাব থাকছে না। বিগত সংসদে আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিসহ মহাজোটের শরিক দলগুলোর আসনসংখ্যা কমেছে এবার। আসনসংখ্যা হ্রাস এবং নতুন মন্ত্রিসভায় জোটের নেতারা জায়গা না পাওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রতি মনঃক্ষুণ্ন হয় দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা।

তবে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আগেই চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, নতুন মন্ত্রিসভায় তাদের কেউ মন্ত্রী হবেন না। এ কারণে জাতীয় পার্টি ওই হিসাবে নেই। তবে মহাজোটের অন্য শরিক দলের কোনো নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার কথা জানান।

১৯ জানুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলের নেতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পাশাপাশি জোটের কোনো নেতাকে বক্তব্যও দিতে দেওয়া হয়নি, বিষয়টিও জোটের নেতাদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করে।

যদিও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতারা ভিন্ন কথা বলছেন। ১৪ দলের তিনজন নেতা বলেছেন, মন্ত্রিত্ব পাওয়াই রাজনীতি না। জোটের রাজনীতিতে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। ২০০৪ সালে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, সে প্রাসঙ্গিকতা এখনো আছে। একসঙ্গে রাজনীতি করলে একটু ভুল-বোঝাবুঝি হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এই মুহূর্তে ১৪ দলে কোনো সমস্যা নেই।

১৪ দল বা মহাজোটের নেতাদের অসন্তোষ বা মনঃক্ষুণ্ন, যে কারণেই হোক—সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ১৪ দলের শরিকেরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে তাঁদের জন্য ভালো এবং সরকারের জন্যও ভালো। ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের পর বিরোধী দল কে হবে, সে বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। যদিও শেষ পর্যন্ত ১৪ দলের নেতারা পরে বিরোধী দলে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি।

আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে আমন্ত্রণ না পাওয়া ও মন্ত্রিসভায় দলের জোট শরিকদের জায়গা না পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও আওয়ামী লীগের জোট ঠিক আছে। এখনো পর্যন্ত জোটে ভাঙন ধরার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে জোটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের এক ধরনের ‘শীতল যুদ্ধ’ এখনো চলমান।

বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টে অসন্তোষ?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে বিভিন্ন সময় ঐক্যফ্রন্ট ভাঙার কথা শোনা গেলেও এখনো পর্যন্ত তা টিকে আছে। ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে জোট ও ফ্রন্টের নেতাদের দ্বিমত শুরু হয় জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে। কিছু কিছু আসনে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মনোনয়ন না দিতে চাওয়ায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে বিএনপি। পরে নিজেদের অনেক জনপ্রিয় নেতাকে বাদ দিয়ে জোট রক্ষার্থে তুলনামূলক কম পরিচিত ও অজনপ্রিয় নেতাকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। সে যাত্রায় জোটগত দ্বন্দ্ব কিছুটা নিরসন করতে সক্ষম হয় দলটি।

এরপর জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হয় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিএনপি কারণ খোঁজার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ‘দোষত্রুটি’ ঢাকার চেষ্টা করেছে। এরই মধ্যে ৮ আসনে জয় পাওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একধরনের টানাপোড়েনও শুরু হয় বিএনপির। সেটির অন্যতম কারণ হলো, ঐক্যফ্রন্টের একটি অংশ জাতীয় সংসদে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যদিও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের দিনই ফল প্রত্যাখ্যান করে এবং সংসদে শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকে।

ঐক্যফ্রন্টের ৮টি আসনের মধ্যে ২টি আসনে গণফোরামের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। গণফোরাম সংসদে যাওয়ার বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক। এ কারণে সংসদে যাওয়ার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান এবং ঐক্যফ্রন্টের ভেতরে সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জোরালো হওয়ায় জোটে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এই আলোচনার অংশ হিসেবে গত শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ও ২০-দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক অলি আহমদ বলেছেন, ‘এই সরকার যে নির্বাচন করেছে, সেটাকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা আশা করব, বিএনপির যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা জাতির সঙ্গে প্রতারণা-বেইমানি করবেন না, সংসদে যাবেন না।’ তাঁর এই বক্তব্যের পর একটি বিষয় সামনে আসছে, সেটি হলো—তাহলে শেষ পর্যন্ত কি বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যাচ্ছে?

ঐক্যফ্রন্টে দ্বিমত দেখা দেওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ জামায়াত-বিরোধিতা। বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। গত ২৭ ডিসেম্বর ভারতীয় দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিএনপির টিকিট পাবে জানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টের অংশ হতেন না। তাঁর এই মন্তব্যের পর কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হয় বিএনপি, যদিও এটি জোটে ভাঙন ধরানোর মতো কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি।

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে এগোলেও জোট ভাঙার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে কিছু কিছু বিষয় পরিষ্কার না হলে এই জোট শেষ পর্যন্ত কত দূর এগোতে পারবে, সেটিও এখন আলোচনার মূল বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন :

এই বিভাগের সর্বশেষ