logo
সোমবার , ১৭ অক্টোবর ২০২২ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ক্যারিয়ার ভাবনা
  5. খেলা
  6. জাতীয়
  7. টেক নিউজ
  8. দেশের খবর
  9. প্রবাস
  10. ফিচার
  11. বিনোদন
  12. রাজনীতি
  13. লাইফস্টাইল
  14. সম্পাদকীয়
  15. সাফল্য

ভেজাল ওষুধে মানুষের সর্বনাশ

প্রতিবেদক
admin
অক্টোবর ১৭, ২০২২ ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় ওয়েস্ট ল্যাবরেটরিজ (আয়ু) নামে এক ওষুধ কারখানার অনুমোদন দিয়েছিল ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। ২০১৬ সালে এখানে নিয়মিত আয়ুর্বেদিক ওষুধ উৎপাদন করার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর অনুমোদন দেয়। কিন্তু আয়ুর্বেদিক ওষুধের আড়ালে এ কারখানায় দিনের পর দিন তৈরি হতে থাকে গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন রোগের নকল ওষুধ। অভিযান চালিয়ে ভেজাল সিন্ডিকেটের দুজনকে গ্রেফতার করে কারখানা সিলগালা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর।

ইউনানি ওষুধ উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স রয়েছে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠানের। নীতিমালা অনুসরণ করে ওষুধ উৎপাদনের কথা তাদের। তা না করে বৈধ কারখানায় নকল ওষুধ উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি। এমন অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মাঠে নামলে বেরিয়ে আসে এসব চিত্র। এসব কারখানায় কিডনি, ক্যান্সার থেকে শুরু করে সব ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধির নকল ওষুধ তৈরি হচ্ছে। আয়ুর্বেদিক কারখানার অনুমোদন থাকায় সন্দেহ করছে না প্রশাসন কিংবা সাধারণ মানুষ। জনবল সংকটের কারণে এসব কারখানায় নিয়মিত তদারকি করতে পারছে না ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় মাঝে মাঝে পরিচালিত অভিযানে এসব অপরাধীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু নকল ওষুধের সিন্ডিকেটের জোরে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছেন তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু কিছু বৈধ ইউনানী-আয়ুর্বেদিক কারখানায় বহুল পরিচিত কোম্পানির ওষুধ নকল করা হয়। তারা ইউনানী কারখানার অনুমোদন নিয়ে কিডনি, লিভার, ক্যান্সারের ওষুধ বানান। আমরা প্রায়ই অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধীকে গ্রেফতার করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কিছুদিন পরই তারা জামিনে মুক্তি পান। ফিরে এসে আবার নকল ওষুধের ব্যবসায় নেমে পড়েন। তিনি আরও বলেন, ওষুধের দোকান মালিকরা কিন্তু জানেন কোনটা আসল ওষুধ আর কোনটা নকল ওষুধ। ন্যূনতম পেশাদারিত্ব না দেখিয়ে এসব অসাধু দোকানদার মানুষের হাতে তুলে দেন ভেজাল ওষুধ। অপরাধী শুধু যারা ভেজাল ওষুধ বানান তারা নন, যারা বিক্রি করেন তারাও সমান অপরাধী। কমিশনের লোভে তারা দিনের পর দিন এ অপরাধ করে চলেছেন।’ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, নকল, ভেজাল, নিম্নমানের এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৬টি মামলা করা হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩০০ টাকা। এ বছর কুমিল্লা, সাভার, চুয়াডাঙ্গা, মিটফোর্ডে বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক আইয়ুব হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নকল ভেজাল ওষুধ চক্র ঠেকাতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে আমাদের জনবল সংকট থাকায় ব্যাপক পরিসরে অভিযান চালানো যায় না। প্রতিটি জেলায় মাত্র একজন করে পরিদর্শক রয়েছে। আমরা জনবল নিয়োগের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এ প্রস্তাবনা অনুমোদন পেলে ভেজাল ওষুধ অভিযান আরও গতি পাবে।’ ডিবি সূত্রে জানা যায়, হুবহু ‘আসল’ মোড়কে গ্যাস্ট্রিক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের নকল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে সংঘবদ্ধ চক্র। যা দেখে ভোক্তাদের আসল-নকল পরখ করা অনেকটাই দুঃসাধ্য। এ চক্রকে সহযোগিতা করছে অতি মুনাফালোভী কিছু ফার্মেসি মালিক। স্বনামধন্য এবং পরিচিত ওষুধ কোম্পানির ওষুধগুলোই নকল করা হয় বেশি। সেগুলো দেখতে হুবহু আসল ওষুধের মতোই। নকল ওষুধগুলো সাধারণত রুগ্ন কারখানা বা ইউনানী-হারবালের মতো কারখানাগুলোতে তৈরি হয়। রাতের শিফটে এসব নকল ওষুধ উৎপাদন করে থাকে এই ভেজাল সিন্ডিকেট চক্র। কারখানা থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় চক্রের তালিকাভুক্ত কিছু ফার্মেসিতে পৌঁছানো হয় এসব ভেজাল ওষুধ। মিটফোর্ডকেন্দ্রিক কিছু অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ী এ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখান থেকে পাইকারিভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এ ভেজাল ওষুধ। গ্রামগঞ্জে ক্রেতার হাতে পৌঁছে যাচ্ছে প্রাণঘাতী এসব নকল ওষুধ। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির পরিচালক জাকির হোসেন রনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা কোম্পানি থেকে ওষুধ কিনে যে দামে বিক্রি করেন, নকল ওষুধ তার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করা হয়। এসব অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে অন্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। গুটিকয় নকল ব্যবসায়ীর জন্য দেশের সব ওষুধ ব্যবসায়ীকে এ অপকর্মের দায় নিতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্ট্রিক এবং মন্টিলুকাস ধরনের ওষুধ বেশি নকল হচ্ছে। মূলত ১৯৮৫ সালের দিকে নকল ওষুধ প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু এখন নকল ওষুধ বাজারজাত করায় আরও সুবিধা হয়েছে। একটি জেলা থেকে নকল ওষুধ উৎপাদন করে একটি নির্দিষ্ট দাম ধরে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিতে ঢাকার কোনো এক ব্যবসায়ীর নামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল ওষুধ কিনে উপজেলা পর্যায়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। সেখানে এই নকল ওষুধগুলোই কোম্পানির আসল ওষুধের দামে বিক্রি করা হয়। নকল ওষুধগুলো তিন-চার হাত বদল হওয়ায় একটি সিন্ডিকেট তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নিচ্ছে।’ বিশ্ববাজারে ১৪৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। ভেজাল এবং নকল ওষুধ এই সুনাম এবং আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

মফস্বলের ওষুধ ফার্মেসিগুলোকে টার্গেট করে একটি অসাধু সংঘবদ্ধ চক্র সারা দেশে ভেজাল ও নকল ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছেন। মাদকের চেয়েও ভয়াবহ ক্ষতি করছে এ ভেজাল ওষুধ। তবে অভিযান পরিচালনা করা হলেও যেসব ওষুধ কোম্পানির ওষুধ নকল হয় তারা সেরকম কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয় না। ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা দেশের ১ লাখ ৩০ হাজার অনুমোদিত ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি হয়। কিন্তু অনুমোদন আছে কিংবা নেই এ রকম অনেক ফার্মেসিতে ওষুধের কোল্ড চেইন সঠিকভাবে মানা হয় না। এর সঙ্গে ভয়াবহতা যোগ করেছে নকল ওষুধ। কিছুদিন আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর অপারেশনের আগে ইনসুলিন ইনজেকশন দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তার স্বজনরা চানখাঁরপুল থেকে ইনজেকশনটি কিনে আনেন এবং তা রোগীকে দেওয়া হয়। কিন্তু ওই রোগীর চোখটা নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ ইনসুলিনটা নকল ছিল। নষ্ট ওষুধ রোগীর জীবনহানিসহ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ফার্মেসি চটকদার ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেয়। রোগীদেরও এসব অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছাড় এড়িয়ে চলতে হবে। এই ছাড়ের ফাঁকে নকল ওষুধ বাজারে ঢোকে। কিছু ইউনানী কিংবা আয়ুর্বেদিক ওষুধের কারখানার আড়ালে নকল ওষুধ তৈরি হয়। তারা সাধারণত বাজারে সবচেয়ে বেশি চলে এমন ওষুধগুলো নকল করেন।’

সর্বশেষ - দেশের খবর