রাসায়নিকমুক্ত হয়নি পুরান ঢাকা, ফের বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ   03 June 2022

‘শুধু স্ত্রী-সন্তানই নয়, মাসহ পরিবারের ১১ সদস্য হারিয়েছি। বাড়ির বাইরে থাকায় বেঁচে ছিলাম তিন ভাই। আবার আমরা বিয়ে করেছি। সন্তান হয়েছে

আগের সন্তানের নামেই তাদের নাম রেখেছি। এদের মধ্যেই পুরনো স্মৃতি খুঁজে পেতে চাই। তবে শুধু নিমতলী নয়, গত ১২ বছরে পুরান ঢাকায় ছোট-বড় আরো অনেক রাসায়নিকের আগুনের ঘটনায় অনেক মানুষ পুড়ে মরেছে। এর পরও এখনো কেন এ এলাকা রাসায়নিকমুক্ত হলো না, এটাই আফসোস। তাই সব সময়ই মনের মধ্য প্রশ্ন জাগে, আর কত মানুষ পুড়ে মরলে রাষ্ট্রের টনক নড়বে?’
কথাগুলো বলছিলেন ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ রাসায়নিকের আগুনে পরিবারের ১১ সদস্যকে হারানো মো. গোলাম এলাহি। গতকাল বৃহস্পতিবার ৪৩ নম্বর নবাব কাটরার নিজ ভবনের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে কালের কণ্ঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

গোলাম এলাহি বলেন, ‘সেই আগুনে আমি, আমার ভাই দিদার ও ফারুক পারিববারিক কাজে বাড়ির বাইরে ছিলাম। এ কারণে আমরা বেঁচে গেলেও পুড়ে মারা যায় আমাদের বৃদ্ধা মাসহ স্ত্রী-সন্তানরা। ঘটনার অনেক পরে আমরা তিন ভাই-ই বিয়ে করেছি। ওই আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া আমার দুই যমজ ছেলের নাম ছিল ইমতিয়াজ গোলজার ও ইসতিয়াক গোলজার। ফের আমার পিঠাপিঠি দুই ছেলে হয়েছে। আগের সন্তানদের স্মৃতি ধরে রাখতে একই নাম রেখেছি এই দুই ছেলের। ওই আগুনে মারা গিয়েছিল মেজো ভাই দিদারের এক ছেলে ও এক মেয়ে। বর্তমানে দিদারের দুই ছেলে-মেয়ে হলে আগের সন্তানদের নামে তাদের নাম রাখা হয়েছে ইমরান দিদার ও আদ্রিতা দিদার। আগুনে ফারুকের দুই মেয়ে মারা গিয়েছিল। বর্তমানে তার দুই ছেলে-মেয়ে। আগের ছেলের নামে বর্তমান ছেলের নামও আইয়ান। ’

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে পুরান ঢাকার রাসায়নিকের আগুন নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানা যায়। তারা বলছিল, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলী ট্র্যাজেডিতে নারী, শিশুসহ ১২৫ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবছর দিনটিকে ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি’ হিসেবে স্মরণ করে। এ ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের দোকান ও গুদাম সরিয়ে নেওয়ার জোরালো দাবি ওঠে। সরকারও এ নিয়ে সময় বেঁধে দিয়েছিল। তবে আজো তা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এলাকাবাসী জানায়, নিমতলীর পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় বড় আগুনে প্রাণহানির সংখ্যা ৭১। এ দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনারই উৎস রাসায়নিকের গুদাম। এর মধ্যে আরো অন্তত অর্ধশত আগুনের ঘটনার তথ্য এলাকাবাসীর জানা। তবু সেই রাসায়নিকের সঙ্গেই বাস করতে বাধ্য হচ্ছে স্থানীয়রা। আর কতজন লাশ হলে রাষ্ট্র পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে নেবে—প্রশ্ন রেখে তাদের একজন বলেন, পুরান ঢাকাকে আর মৃত্যুপুরী না বানাতে চাইলে এখনো সময় আছে রাসায়নিক গুদাম সরানোর।

গোলাম এলাহি আরো বলেন, ‘আগুনের ঘটনার পর রাষ্ট্রের কেউ আমাদের পরিবারের খোঁজ নেয়নি। আমার ধারণা, অন্যদেরও নেয়নি। ওই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কন্যা হিসেবে নতুন জীবন পাওয়া মেয়েরাও আর এই বাড়িতে আসেনি। ঘটনার দিন আমরা এলাকায় মিলাদ মাহফিল, দোয়া, এলাকা থেকে রাসায়নিক সরানোর প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করব। ’

গতকাল দুপুরে নিমতলীর ঘটনাস্থল বাড়িটির সামনে গিয়ে মানুষের ভিড় দেখা যায়। ভবনটি লাগোয়া নিজ দোকানে বসে ছিলেন মুরব্বি মোশারফ হোসেন। এ প্রতিবেদককে পেয়ে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘প্রতিবছরই তো আপনেরা আহেন, লাভ কী? রাসায়নিক গুদাম তো সরে না। আর কত লিখবেন? চোহের সামনে কত মানুষ পুইড়া মরল। আবার আইতাছে হেই দিন। ’

পাশের অন্য দোকানদার মো. মানিক বলেন, ‘হেই আগুনে আমার চাচা রহিম মরছিল। এলাকায় এহনো অনেক রাসায়নিক গুদাম আছে। সেগুলো না সরালে আগুনে আরো মানুষ পুইড়া মরব। ’ এ সময় অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে কথা বলে একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। তাঁরা জানান, প্রতি সকালে আতঙ্ক নিয়ে তাঁদের ঘুম ভাঙে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে রাসায়নিক পদার্থ থেকে সৃষ্ট আগুনে ৬২ পরিবার তাদের স্বজনদের হারিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারপ্রতি ২০ লাখ টাকা সরকারি অনুদান দেওয়ার দাবির পাশাপাশি ৩ জুন দিনটিকে ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি’ দিবস ঘোষণার দাবি তুলেছে স্থানীয়রা। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী অবিলম্বে রাসায়নিক কারখানাগুলো সরিয়ে আবাসিক এলাকা নিরাপদ করার আহ্বানও জানায় তারা। অথচ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি সরকারি প্রতিশ্রুতি।

আগুনে স্বজনহারা মোহাম্মদ রিপন বলেন, ‘আমাদের পুনর্বাসন করার কথা ছিল সরকারের। এ পর্যন্ত পুনর্বাসন পাইনি। ’ শাহনাজ বেগম বলেন, ‘নিমতলীর আগুনে আমার বড় ভাই, বোন, বোনের ছেলে—সবাই মারা গেছে। এখনো এলাকা রাসায়নিকমুক্ত হলো না। ’

ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের দায়সারা একটি সাধারণ ডায়েরির মধ্যেই থেমে রয়েছে তদন্তকাজ। এমনকি যে রাসায়নিক গুদামঘর থেকে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি, সেই গুদামের মালিকের নাম পর্যন্ত উল্লেখ নেই সেখানে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বংশাল থানার ওসি আবুল খায়ের গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিমতলী আগুনের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। ’

নিমতলী আগুনের ঘটনায় পুরান ঢাকায় অভিযানে প্রায় এক হাজার রাসায়নিক পদার্থের গুদাম বা কারখানার মধ্যে লাইসেন্স পাওয়া যায় মাত্র ১২৭টির। এমন তথ্য দিয়ে এই বৈধ-অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো সে সময় এক মাসের মধ্যে সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত টাস্কফোর্স।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান রয়েছে প্রায় ২২ হাজার। অনুমোদন বা লাইসেন্স আছে মাত্র ৮০০টি গুদামের। বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও আছে কেমিক্যাল ও পারফিউমের গুদাম।

স্থানীয়রা বলছে, নিমতলী বা চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ ঘটনার পরও রাসায়নিক পদার্থের ঝুঁকি থেকে বের হতে পারেনি এলাকাবাসী। নিমতলীর পর চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যাল গুদাম ও দোকান সরানোর ঘোষণা দিয়েছিল একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। ঘোষণা বাস্তবায়নে ১৫ দিনের অভিযান চালিয়েছিল সিটি করপোরেশন। কয়েকটি গুদাম সিলগালাও করা হয়েছিল। তবে বিশেষ পরিবর্তন আসেনি তাতে। প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে রাসায়নিকের কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

দেশের খবর

আপনার মতামত লিখুন :