‘বাবুনগরীর পরামর্শে সেনাবাহিনী নামার আশায় শাপলা চত্বরে অবস্থান’

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ   21 December 2020

নিউজ ডেস্ক:
সাতবছর আগে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত পুরো ঘটনার দায়ভার হেফাজতে ইসলামের সে সময়ের মহাসচিব ও বর্তমান আমীর জুনাইদ বাবুনগরীর ওপর দিয়েছেন সংগঠনটির সদ্য সাবেক নেতারা। একজন সাবেক যুগ্ম মহাসচিব দাবি করেছেন, তৎকালীন আমীর শাহ আহমদ শফীকে না জানিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের রাতভর শাপলা চত্বরে রেখে দেন বাবুনগরী। তার ধারণা ছিল, সারারাত শাপলা চত্বরে অবস্থান নিতে পারলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তাতে সেনাবাহিনী নামতে বাধ্য হবে।

সম্প্রতি নগরীর জামালখানে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে প্রয়াত শাহ আহমদ শফীর জীবনকর্ম, অবদান শীর্ষক আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলা হয়েছে।

শফীপন্থী আলেম-ওলামারা দাবি করেছেন, আহমদ শফীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন তারা।

সভায় হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব সলিমুল্লাহ বলেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে যে ঘটনা হয়েছিল তার পুরো দায়ভার জুনাইদ বাবুনগরীকে নিতে হবে। অনেকেই বলেছিলেন মিটিং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার জন্য। এমনকি আল্লামা আহমদ শফী হুজুরও চেয়েছিলেন সন্ধ্যা ৬টায় কর্মসূচি শেষ করতে। কিন্তু বাবুনগরী সারারাত অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। তিনি হুজুরকে জানান, সারাদেশ থেকে মাদরাসার ছেলেরা শাপলা চত্বরের উদ্দেশে আসছে। সারারাত থাকতে পারলে সেনাবাহিনী নামবে। এরপর তিনি হুজুরকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। হুজুর মুখ ফুটে একটি কথাও বলেননি। বাবুনগরীর ব্যক্তিগত ইচ্ছায় শাপলা চত্বরের অবস্থান দীর্ঘায়িত হয়েছে।’

শাপলা চত্বরের ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া বাবুনগরীকে ছাড়াতে তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী বর্তমান তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে হেফাজতের নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন বলেও তথ্য দেন সলিমুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘বাবুনগরীকে জেল থেকে ছাড়াতে সেদিন আমরা চট্টগ্রাম শহরের দেবপাহাড়ে একটি ভবনে তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রী ও বর্তমান তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম। সেই বাবুনগরী এখন আমাদের দালাল বলেন। শাপলা চত্বরে যারা আহত হয়েছেন তাদের জন্য ফান্ড কালেকশনের কথা ছিল। বাবুনগরীর খামখেয়ালিরর কারনে সেটিও করা যায়নি।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেফাজত ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের মহাসচিব মো. ফয়জুল্লাহ অভিযোগ করেন, শাহ আহমদ শফীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘এখন থেকে আমরা সামনে যাব, পিছনের দিকে আর যাব না। কারা ঢাকায় বসে কিংবা ফটিকছড়ি-হাটহাজারীতে বসে ষড়যন্ত্র করেছে, সময়ে জাতির কাছে সব প্রকাশ করা হবে। যারা ষড়যন্ত্র করেছে, মিথ্যাচার করেছে, যারা অর্থের যোগান দিয়েছে তারাই হেফাজত ইসলামের মূল শত্রু। আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। যে কোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার জন্য আলেম-ওলামাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

হেফাজত ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দীন রুহী বলেন, ‘হুজুরের জীবদ্দশায় হাটহাজারী মাদরাসায় হামলা, ভাংচুর করা হয়। হুজুরের ওপর নির্যাতন করা হয়। গৃহবন্দী করে উনার খাবার-ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। হুজুর অসুস্থ হয়ে পড়লে উনাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স আসতে বাধা দেওয়া হয়। এভাবে নির্যাতন করে আহমদ শফী হুজুরকে শাহাদাত বরণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। উনাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং রাতে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

মৃত্যুর আগে জুনাইদ বাবুনগরীও শফীকে অসম্মান করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবুনগরী ক্ষমতার লোভে অনেকের কাছে বলেছেন- এই বুড়া (শফী) এখনও মরছে না কেন, আমরা কখন আমীর হব? বাবুনগরী আরও অনেকবার অনেকের সামনে হুজুরকে অসম্মান করে কথা বলেছেন। জালেমরা জুলুম-অত্যাচার চালিয়েছে শফী হুজুরের ওপর। হুজুরের সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। এমনকি তাকে নির্মমভাবে আহতও করা হয়েছে।’

বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে শফীর হত্যাকারী ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদেরও চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়ে রুহী বলেন, ‘আহমদ শফী হুজুরকে হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা এবং বিচারের মুখোমুখি করা সরকারের দায়িত্ব। তদন্ত হোক, অসুবিধা কি? তদন্ত হলে কাদের এত ভয় ! সমস্যাটা কোথায় ?’

জুনাইদ বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে রুহী বলেন, ‘আপনি অনেক বহুরুপী। আপনার সাথে আমার একসময় ভালো যোগাযোগ ছিল। আপনি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আপনি একজন বড় প্রতারক। রুমের মধ্যে একরকম, রুমের বাইরে গেলে আরেকরকম। সরকারের কার সাথে কোথায় গেছেন, কার পায়ে ধরেছেন জানা আছে। কার কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছেন, কোন জায়গায় গিয়ে টাকা নিয়েছেন- সব আমাদের জানা আছে। আমরা যদি মুখ খুলি মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারবেন না।’

সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে বাবুনগরী রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ আনছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জেল থেকে ছাড়া পাবার পর বাবুনগরী বলেছিলেন, তাকে জেলখানায় কেউ একটি বড় কথাও বলেনি। অথচ এখন তিনি বলছেন তাকে নাকি রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। কত বড় মিথ্যুক ! সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য নির্যাতনের কথা বলে আলেম-ওলামাদের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা চেষ্টা করেছেন।’

বাবুনগরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ‘সাবধান হয়ে যান। মিথ্যা কথা বলবেন না। আপনাকে নিয়ে লোকজন ঠাট্টা করে, হাসাহাসি করে। আমাদের লজ্জা হয়।’

দেশের অনেক নিষিদ্ধ-বিতর্কিত সংগঠনের সাথে বাবুনগরী হাত মিলিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সময়মতো মুখ খুলব। তখন টিকে থাকতে পারবেন না। হেফাজতে ইসলামের কমিটি করেছেন। ১৫১ জনের কমিটির মধ্যে বাবুনগরীর আত্মীয় আছে ২২ জন। স্বজনপ্রীতি করে মেয়ের জামাই থেকে শুরু করে মামাতো ভাই, খালাতো ভাই সবাইকে কমিটিতে স্থান দিয়েছেন।’

হেফাজতের ইসলামের বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে সবাইকে নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন মাইনুদ্দিন রুহী।

সভায় শাহ আহমদ শফীর পরিবারের পক্ষ থেকে শ্যালক মো. মঈন উদ্দিন ও ছেলে হেফাজতের সাবেক প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানী বক্তব্য রাখেন। এছাড়া আলেম-ওলামাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম, নুরুল আলম, ইয়াসিন হাবিব, শামসুল আলমসহ আরও কয়েকজন বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম নগরীর নাসিরাবাদের মেজবাহুল উলুম মাদরাসার পরিচালক আব্দুল জব্বার।

সভায় শাহ আহমদ শফীর জীবনের শেষ তিনদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আলেম-ওলামারা। বক্তব্যে তারা বলেন, ‘শফী হুজুরের ওপর জুলুম করা হয়েছে। আনাস মাদানী শফী হুজুরের সন্তান। অথচ আব্বার জানাজায় তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। একজন সন্তান বাবার জানাজায় আসতে পারবে না, এর চেয়ে বড় জুলুম আর কি হতে পারে ? সেদিন যারা শফী হুজুরের পক্ষে ছিল তাদের ওয়াজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। এখন পুলিশ হুজুরদের দেখলে তল্লাশি করে, সন্দেহ করে। জায়গায় জায়গায় তাদের আটকে দেওয়া হচ্ছে। শফী হুজুর বেঁচে থাকতে তো এমন হয়নি। এখন কেন হচ্ছে ?’

গত ১৮ সেপ্টেম্বর শতবর্ষী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শাহ আহমদ শফীর জীবনাবসান হয়। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বড় মাদরাসা হিসেবে হিসেবে পরিচিত দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদরাসার মহাপরিচালক ছিলেন তিনি। তিনদিন ধরে ওই মাদরাসায় আহমদ শফীকে অবরুদ্ধ করে ছাত্র বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ শফীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং ঢাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর থেকে শফীর অনুসারীরা তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছিলেন।’

আপনার মতামত লিখুন :