ঢাকা, আজ শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২০

চট্টগ্রাম উত্তর আ’লীগের সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের: মাস্তানি করে বিলবোর্ডে ছবি দিয়ে নেতা হওয়া যাবে না

প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৮ ১৩:০৬:৪৪ || আপডেট: ২০১৯-১২-০৮ ১৩:০৬:৪৪

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, স্লোগান দিয়ে নেতা বানানো যাবে না। বিলবোর্ডে বড় বড় ছবি দিয়ে নেতা বানানো যাবে না। পোস্টারে সুন্দর সুন্দর ছবি দিয়ে নেতা হওয়া যাবে না। মাস্তানি করে নেতা হওয়া যাবে না। নেতা হতে হবে দলের নিয়মশৃঙ্খলা মেনে। নেতা হবেন ত্যাগী কর্মীরা। যারা দলের দুঃসময়ে দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। নগরীর লালদীঘি ময়দানে শনিবার দুপুরে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। সন্ধ্যায় নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। লালদীঘি মাঠে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন সঞ্চালনা করেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ সালাম।

তবে সম্মেলন শুরুর আগে জেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতা গিয়াস উদ্দিন ও আতাউর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে মাঠে অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে বেশ কয়েকজন কর্মী কম-বেশি আহত হন। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন নেতা উৎপাদন করে। কিন্তু পোস্টার লাগাতে কর্মী পাওয়া যায় না। চারদিকে শুধু নেতা আর নেতা। মনে রাখবেন, কর্মীরাই একদিন নেতা হবেন। যে নিজেকে নেতা দাবি করে, সে কখনও নেতা হতে পারবে না। যাদের ব্যানার-পোস্টার বেশি তারা নেতা হতে পারে না। যারা মারামারি করে কলহ তৈরি করে, তারা দলে বিশৃঙ্খলা করতে এসেছে। বসন্তের কোকিলকে নেতা বানানো যাবে না। দুঃসময় এলে তাদের ৫ হাজার ভোল্টের বাতি দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী ও সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, কেন্দ্রীয় উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, উপদফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

এছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন- মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, মাহফুজুর রহমান মিতাসহ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকরা। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সম্মেলন উদ্বোধন করেন।

সম্মেলন উদ্বোধনের আগে সকাল ১০টার দিকে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। সম্মেলন উপলক্ষে সকালেই বিভিন্ন স্থান থেকে বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে আসতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শুরুর আগেই উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দীনের অনুসারী নেতাকর্মীরা মাঠে অবস্থান নেন। সকাল ১০টার দিকে মিছিল নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী আতাউর রহমানের অনুসারীরা। মাঠে অবস্থান নেয়াকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রথমে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও পরে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা। এ সময় মঞ্চ থেকে জ্যেষ্ঠ নেতারা বারবার নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার অনুরোধ করেন। ১৫ থেকে ২০ মিনিট সংঘর্ষ চলার পর পুলিশ মাঠে ঢুকে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ সময় সম্মেলনস্থলে উত্তেজনা দেখা দিলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় ও আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ঢাকা মহানগরে যাদের নামে বেশি স্লোগান, যাদের নামে বেশি বিলবোর্ড, যাদের নামে বেশি পোস্টার তারা কেউ সভাপতি-সম্পাদক হতে পারেনি। কারও স্লোগানে আমরা নেতা বানাব না। আমরা সুশৃঙ্খল আওয়ামী লীগ চাই, সুসংগঠিত আওয়ামী লীগ চাই। বিশৃঙ্খলা চাই না। সুবিধাবাদীদের দলে চাই না। অতিথি পাখিদের স্থান হবে না আওয়ামী লীগে। ত্যাগী কর্মীদের নেতা বানানো হবে। আমাদের বহু কর্মী আছেন। খারাপ লোকের কোনো প্রয়োজন নেই। বুয়েটে আবরারকে যারা হত্যা করে- এ ধরনের কর্মীর আমাদের প্রয়োজন নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কথায় কথায় যারা কলহ করে, মারামারি করে এ ধরনের কর্মীর আমাদের প্রয়োজন নেই। যারা রাজশাহীতে অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলে দেয় এ কর্মীর আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। মাস্তানি করে, গডফাদারগিরি করে নেতা হওয়া যাবে না।

বিএনপির উদ্দেশে সেতুমন্ত্রী বলেন, এত আঘাত, রক্তপাত ও সংঘাত সহ্য করে এগিয়ে যায় আওয়ামী লীগ। যারা ভাবেন একটা ধাক্কা দিলে আওয়ামী লীগ পড়ে যাবে। তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। আমরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মী। তাই আমাদের কেউ রুখতে পারে না। আমরা এগিয়ে যাবই, যাব।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, শুদ্ধি অভিযান সফল করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সবকিছু নজরদারিতে আছে। কে কখন জালে আটকাবে জানি না। চট্টগ্রাম যেন খারাপ খবরের শিরোনাম না হয়, এটাই প্রত্যাশা করি। এ নগরে মেট্রোরেল হবে, টানেলের কাজ চলছে, চার-ছয় লেন রাস্তা হয়েছে। আজ বাদল নেই, তাকে স্মরণ করেই বলছি, কালুরঘাটে রেল ও সড়ক সেতু হবে।

সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাজনীতিকদের হাট বসিয়েছিলেন। আর তাতে অনেক রাজনীতিককে বেচাকেনা করেছেন। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদসহ সমগ্র বিশ্ব প্রশংসা করে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে আক্ষেপ করেন। অথচ শুধু একটি দল প্রশংসা করতে পারছে না। উন্নয়নের পথে দেশের এ অভিযাত্রা তাদের কাছে গাত্রদাহ মনে হয়।

তিনি আরও বলেন, তারা খালেদা জিয়ার জামিন চাইতে গিয়েছিল সুপ্রিমকোর্টে। সেখানে প্রধান বিচারপতির উপস্থিতিতে ৬ বিচারপতির বেঞ্চে তারা যেভাবে হাঙ্গামা করেছে, দেশের ইতিহাসে কখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বিএনপি যে ধরনের হট্টগোল করেছে তা দেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, বিএনপির কাজ এখন শুধু প্রেস কনফারেন্স করা। প্রেস কনফারেন্স করে শুধু আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা। বিএনপির কাণ্ডারি দুর্নীতির বরপুত্র তারেক রহমানকে এ দেশের মানুষ চায় না। দেশের মানুষ তারেক রহমানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

কাউন্সিলে সভাপতি সালাম ও সাধারণ সম্পাদক শেখ আতা : চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন এমএ সালাম। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন শেখ আতাউর রহমান আতা। সন্ধ্যায় নগরীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে কাউন্সিলরদের সরাসরি গোপন ভোটে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নবনির্বাচিত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন।

সম্মেলন ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার যুগান্তরকে জানান, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ৩৬৬ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৩৫৩ জন কাউন্সিলর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করেন।