ঢাকা, আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

হলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায় : সাত জঙ্গির ফাঁসির আদেশ

প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৮ ০৮:৪৭:২৭ || আপডেট: ২০১৯-১১-২৮ ০৮:৪৭:২৭

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নিষ্ঠুর ও নারকীয় হামলা মামলায় সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।

জঙ্গি হামলার ঘটনার ৩ বছর ৪ মাস ২৬ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা হয়। বিচার শুরুর পর থেকে ৫৩তম কার্যদিবসে রায় ঘোষণা। আইনের শাসন দিয়ে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তা এ রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত জঙ্গি হল- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

এছাড়া অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দিয়েছেন আদালত। রায়ে হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারী হিসেবে তামিম চৌধুরীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের নামে জননিরাপত্তা বিপন্ন ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে নারকীয় হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়।

জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজানে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এ হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহির্প্রকাশ ঘটেছে।

নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষ যখন রাতের খাবার খেতে যান, তখনই হঠাৎ তাদের ওপর চালানো হয় জঙ্গি হামলা। জঙ্গিরা শিশুদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড চলায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তারা নিথর দেহগুলো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়।

মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান বেকারি। কলঙ্কজনক এ হামলার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চরিত্র হরণের চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এটা প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

এর ফলে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়। কাজেই সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না।

এক্ষেত্রে আসামিদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯-এর ৬(২)(অ) ধারায় প্রদত্ত সর্বোচ্চ সাজাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।

হতভাগ্য মানুষগুলোর স্বজনরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবেন। বিচারক বলেছেন, এ রায়ের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।

মামলার ঘটনাপ্রবাহ, এজাহারের বর্ণনা, চার্জশিট (অভিযোগপত্র), সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও দু’পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক বিশ্লেষণ করে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন।

এদিন (বুধবার) দুপুর ১২টা ৬ মিনিটের দিকে রায় পড়া শুরু হয়। দুপুর ১২টা ১৮ মিনিটের দিকে রায় ঘোষণা শেষ করেন বিচারক।

রায় ঘোষণার পর আদালতের ডকে (আসামি রাখার নির্ধারিত স্থান) থাকা আসামিরা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিতে থাকে।

এ সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান রিগ্যান পকেট থেকে আইএসের লোগো সংবলিত টুপি পরে আদালতের ভেতরই স্লোগান দিতে থাকে।

এছাড়া রায় ঘোষণার পর প্রিজনভ্যানে থাকা অপর আসামি জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীর মাথায়ও আইএসের টুপি দেখা যায়।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই আসামিরা কিভাবে আইএসের টুপি পেল তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। এরই মধ্যে কারা অধিদফতর ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। রায়ের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে।

ভবিষ্যতে এ দেশে মৌলবাদী চিন্তাধারা থাকবে না। যে আসামি খালাস পেয়েছে তার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর বিশ্লেষণ শেষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

জানতে চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ রায়ে আসামিরা সন্তুষ্ট হয়নি। তারা উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে। শিগগিরই এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, আইনের শাসন দিয়ে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তা এ রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

রাজনৈতিক স্বার্থে সাধারণত জঙ্গিবাদ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নানা কারণে এ ধরনের মামলার রায়ও তেমন কাঙ্ক্ষিত হয় না। তবে এক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলেছেন আদালত : হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারী ছিল তামিম আহমেদ চৌধুরী।

আসামি আসলাম হোসেন র‌্যাশ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করে, ‘আমি তামিম ভাইয়ের কাছে গুলশান বা কূটনৈতিক এলাকায় আক্রমণের উদ্দেশ্য জানতে চাই। তামিম ভাই বলে, আমাদের সংগঠন নব্য জেএমবি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত। আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই গুলশান কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করা প্রয়োজন।’

কাজেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে, তামিম চৌধুরীর নেতৃত্বে হলি আর্টিজানে হামলা হয়। বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তামিম চৌধুরীর পরিকল্পনায় নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশান হলি আর্টিজানে হামলা করে।

হামলায় নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে গ্রেনেড, আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো চাপাতি দিয়ে ১৭ জন বিদেশি, চারজন বাংলাদেশি নাগরিক, দু’জন পুলিশ অফিসার এবং অনেককে গুরুতর আহত ও জিম্মি করা হয়।

হলি আর্টিজানে হামলা মামলা ও বিচার : ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দুই পুলিশসহ দেশি-বিদেশি ২৩ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যায়।

এছাড়া হামলায় অন্তত ৩০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ডে’ পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। অভিযানে এক জাপানি ও দু’জন শ্রীলংকানসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

জঙ্গি হামলার ঘটনায় ওই বছরের ৪ জুলাই গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করে জীবিত আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর এ চার্জশিট দাখিল করেন। ঘটনায় জড়িত ‘চিহ্নিত’ বাকি ১৩ জন এরই মধ্যে বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়ায় তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়।

এরপর গত বছরের ২৬ নভেম্বর এ মামলায় আট আসামির বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। আর চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

৩০ অক্টোবর আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতের কাছে আট আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। এরপর চলতি মাসের ৬ নভেম্বর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে সব আসামির মৃত্যুদণ্ড চান।

আর ১৭ নভেম্বর এ মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। মামলায় চার্জশিটভুক্ত ২১১ সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

হলি আর্টিজানে হামলার উদ্দেশ্য : হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পেছনে জঙ্গিদের তিনটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, কূটনৈতিক এলাকায় হামলা করে নিজেদের সামর্থ্য জানান দেয়া। দ্বিতীয়ত, বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে নৃশংসতার প্রকাশ ঘটানো।

তৃতীয়ত, দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা। এ হামলায় অংশগ্রহণকারী জঙ্গিরা ছিল নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য।

যেভাবে হলি আর্টিজানে হামলা : ইসাবা’র (সামরিক) পাঁচজন সদস্য দুটি দলে বিভক্ত হয়ে বাসা থেকে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার উদ্দেশে রওনা হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে কাঁধের ব্যাগে অস্ত্র-গুলি, গ্রেনেড, চাকু নিয়ে বের হয়।

রাত ৮টা ৪২ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। প্রথমে নিবরাস ইসলাম ও মীর সামেহ মোবাশ্বের এবং একটু পর রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম বাঁধন হলি আর্টিজানের মেইন গেটে যায়।

গেটের নিরাপত্তাকর্মী নূর ইসলাম তাদের পরিচয় ও কোথায় যাবেন জিজ্ঞাসা করলে নিবরাস নিরাপত্তাকর্মীর ডান চোখের নিচে ঘুষি মেরে তারা হলি আর্টিজানের ভেতর ঢুকে যায়। ঢুকেই গুলি ও বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

৩০ মিনিটের মধ্যেই পাঁচ জঙ্গি অস্ত্র-গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেশি-বিদেশিদের হত্যা করে। বিভিন্ন রুম, টয়লেট, চিলারঘর, হিমঘর ইত্যাদি স্থান থেকে বিদেশিদের বের করে এনে এ হত্যাযজ্ঞ চালায়।

একপর্যায়ে তারা নিথর দেহগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যার ছবি তুলে অ্যাপসের মাধ্যমে বাইরে অবস্থানরত জঙ্গি তামিম চৌধুরী ও মারজানের কাছে পাঠায়।

হামলার পরিকল্পনা : হলি আর্টিজানে হামলার পরিকল্পনা কয়েকটি স্তরে গৃহীত হয়। এখানে হামলার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা, বোনারপাড়ায় তামিম চৌধুরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, সরোয়ার জাহান, রায়হানুল ইসলাম রায়হান, নুরুল ইসলাম মারজান, শরিফুল ইসলাম খালেদ, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী একত্রিত হয়ে মিটিং করে।

তারা হলি আর্টিজান বেকারিতে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করে। তামিম চৌধুরী এ হামলায় মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবে বলে ওই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

হামলার পরিকল্পনায় আসলাম হোসেন র‌্যাশ ও শরিফুল ইসলাম খালেদ সমর্থন দেয়। ২০১৬ সালের মে মাসে আবদুস সবুর খান জেএমবিতে যোগদান করে তামিম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে ঢাকায় আসে।

সংগঠনের সদস্যদের হাত ধরে সে মিরপুরের একটি বাসায় ওঠে। তাকে জেএমবির শূরা সদস্য মনোনীত করা হয়। হামলায় লোক সংগ্রহ, অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহের জন্য আবদুস সবুর খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

হামলার অর্থায়ন : নব্য জেএমবির বায়াত গ্রহণকারী সদস্যরা তাদের নিজস্ব সম্পদ ও অর্থ সংগঠনের কাজে ব্যয় করার ব্রত নেয়। সংগঠনের নেতা তানভীর কাদেরী তার নিজের ব্যবহৃত প্রাইভেট কার ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে।

ওই টাকা হলি আর্টিজানে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। আরেক সদস্য আসলাম হোসেন র‌্যাশ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা সংগঠনে জমা দেয়। এছাড়া সরোয়ার জাহান ও তামিম চৌধুরীর কাছে হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সংগঠনের কাজের জন্য অর্থ আসে।

নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কাজ চালানোর জন্য ১৮ লাখ টাকা ভারত থেকে হুন্ডির মাধ্যমে তামিমের বরাত দিয়ে সরোয়ার জাহানের কাছে আসে। ২০১৬ সালের ২৮ জুন বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের সামনে বাশারুজ্জামান চকলেট ও তানভীর কাদেরী ওই টাকা গ্রহণ করে।

এছাড়া বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা নিজ নিজ এলাকা থেকে চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহ করে সংগঠনের তহবিলে জমা করে। সংগঠনের তহবিলে জমাকৃত টাকা দিয়ে সংগঠনের সদস্যদের বাসা ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ নির্বাহ হতো। অবশিষ্ট টাকা বিভিন্ন অপারেশন উপলক্ষে খরচ হতো।

অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ : হলি আর্টিজানে হামলার জন্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করতে নব্য জেএমবির আসলাম হোসেন র‌্যাশ ও হাদিসুর রহমান সাগরকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

আসলাম হোসেন র‌্যাশ ২০১৬ সালের মে মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চারটি নাইন এমএম পিস্তল, আটটি ম্যাগাজিন ও নাইন এমএম পিস্তলের ৩৫ রাউন্ড গুলি ঢাকার কল্যাণপুরে নিয়ে এসে বাশারুজ্জামান চকলেটকে দেয়।

বাশারুজ্জামান চকলেট সেই অস্ত্র-গুলি মারজানের মাধ্যমে তামিম চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেয়। একইভাবে সাগর ও ছোট মিজান ৩৫টি একে-২২ রাইফেল ও গুলি ভারত থেকে আগেই সংগ্রহ করে।

যা পরে হলি আর্টিজানে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়। এসব অস্ত্র মারজানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বাসায় পৌঁছানো হয়। হামলার ১ মাস আগে তিন থেকে চারটি একে-২২ মামুনুর রশীদ রিপনের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

নুরুল ইসলাম মারজান অপর জঙ্গি ছোট মিজানের মাধ্যমে তিন-চারটি অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য ভারত থেকে সংগ্রহ করে। মারজান তার ভগ্নিপতি হাদিসুর রহমান সাগরের মাধ্যমে গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরক আমের ঝুড়িতে করে ঢাকার বাসায় নিয়ে আসে।

এছাড়া আবদুস সবুর খান মিরপুরের বাশারুজ্জামান চকলেটের বাসায় এবং যাত্রাবাড়ীর একটি বাসায় গ্রেনেড তৈরি করে। তামিম চৌধুরী অস্ত্রগুলো হলি আর্টিজানের হামলাকারীদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করে রাখে।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট : উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশক্রমে সেনাবাহিনী উদ্যোগ নেয়। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও র‌্যাব সম্মিলিতভাবে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।

প্যারা কমান্ডো বাহিনী রাত থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে অপারেশন থান্ডারবোল্ট পরিচালনা করে। সকাল ৭টার দিকে তারা হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট রেকি করে।

সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। তার সদস্যরা ক্রলিং করতে করতে সামনের দিকে এগোতে থাকে এবং গুলি ছুড়তে থাকে পদাতিক ডিভিশন ও স্লাইপার টিম।

এ সময় জঙ্গিরাও গুলি ছুড়তে থাকে। ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে প্যারা কমান্ডো টার্গেট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

পরে অপারেশনের অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করে সকাল সাড়ে ৮টায় অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। সেখান থেকে একজন জাপানি ও দু’জন শ্রীলংকার নাগরিকসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

হামলায় নিহত ও আহত যারা : হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি ২৩ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এদের মধ্যে নয়জন ইতালির, সাতজন জাপানের, একজন ভারতীয়, একজন বাংলাদেশ-আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক, দু’জন বাংলাদেশি ও দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন।

এছাড়া হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের দু’জন স্টাফ মারা যান। এদের মধ্যে একজন অভিযানের সময় ও আরেকজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

নিহত ইতালির নয় নাগরিক হলেন- মার্কো টোনডাট, ভিনজেনজো ডি’অ্যালেস্ট্রো, সিমোনা মন্টি, মারিয়া রিবোলি, নাদিয়া বেনেভেট্ট, অ্যাডেলে পুগলিসি, ক্লদিও ক্যাপেলি, ক্রিশ্চিয়ান রসি ও ক্লদিয়া মারিয়া ডি’অ্যান্টোনা।

জাপানের সাত নাগরিক হলেন- হিডেকি হাশিমোটো, কোয়া ওগাসাওয়ারা, মাকোটো ওকামুরা, হেরোশি তানাকা, ইয়োকি সাকাই, নোবুহিরো কোরুসাকি ও রুই শিমোডাইরা।

ভারতীয় নাগরিক তারিশি জৈন, বাংলাদেশ-আমেরিকার দ্বৈত নাগরিক অবিন্তা কবির, বাংলাদেশি দুই নাগরিক ইশরাত জাহান আখন্দ ও ফারাজ আইয়াজ হোসেন এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রবিউল করিম ও পুলিশ পরিদর্শক সালাউদ্দিন আহম্মেদ খান ভয়াবহ ওই হামলায় নিহত হন।

হলি আর্টিজানের দুই স্টাফ সাইফুল চৌকিদার ওই হামলার সময় ও জাকির হোসেন শাওন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া হামলায় ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।

হামলায় জড়িত নিহত ১৩ জঙ্গি : গুলশান হামলায় জড়িতদের মধ্যে নিহত ১৩ জনের পাঁচজন নিহত হয় হলি আর্টিজান হামলায় অভিযানের সময়ই।

তারা হচ্ছে- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। বাকি আটজন বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত হয়।

তারা হচ্ছে- তামিম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সরোয়ার জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

বাকি ছিল আরও আট জঙ্গি। এদের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে বুধবার আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। একজনকে খালাস দেয়া হয়।