ঢাকা, আজ মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯

৬ হাজার কোটি টাকায় বিহারি পুনর্বাসন!

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৫ ০৯:৩৪:৪৯ || আপডেট: ২০১৯-০৯-২৫ ০৯:৩৪:৪৯

রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে এ দেশে বসবাসরত বিহারিদের বসিলাতে স্থায়ীভাবে আবাসন করে দিতে সরকার ছয় হাজার ১০১ কোটি ২৩ লাখ পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবে সরকার। আর এক হাজার একর জমি কিনতে হচ্ছে মোহাম্মদপুরের বসিলাতে। এই ভবনে বেড লিফট বসাতে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। ছয়টির জন্য ব্যয় হবে ২০ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে প্রথমপর্যায়ে ৭৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। কমন স্পেসসহ ৮০০ বর্গফুটের হবে প্রতিটি ফ্ল্যাট। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রকল্পের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ২০ তলাবিশিষ্ট মোট ৫৮টি আবাসিক ভবন নির্মিত হবে এখানে। প্রতিটি ভবনে ১৫২টি ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা থাকবে। এর মধ্যে থাকবে একটি করে কমন বাথরুম, কিচেন এবং দু’টি করে বেডরুম ও বারান্দা। প্রতিটি ভবনে লিফটের ব্যবস্থা থাকবে। ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থাসহ বিদ্যুতের জন্য পৃথক জেনারেটর এবং সাব-স্টেশন থাকবে। ফ্ল্যাটে ঘরের মেঝের পাশাপাশি রান্নাঘর ও বাথরুমের দেয়ালে টাইলস ছাড়াও রান্নাঘর-কিচেন সেলফ রয়েছে। ভবনগুলোর মধ্যে প্রশস্ত রাস্তাও থাকছে। আট হাজার ৮ শ’টি ফ্ল্যাটসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণে এই প্রকল্পটি কয়েক স্তরে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পে বাণিজ্যিক ভবন, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, মসজিদ, খেলার মাঠ, প্রাতঃভ্রমণের জন্য পার্ক নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে পাম্প হাউজ, ইলেকট্রিক সাব-স্টেশনের লো-আউট নকশায় জায়গা চিহ্নিত করা হবে। প্রথমপর্যায়ের পাঁচটি ২০ তলার যে ভবন নির্মাণ করা হবে তাতে ব্যয় হবে মোট ৪৮৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। এই পাঁচটি ফ্ল্যাট তৈরীতে ১০০ একর জমির প্রয়োজন। প্রতিটি ফ্ল্যাটের মূল্য ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বরাদ্দপ্রাপ্তরা মাসিক বা দৈনিক কিস্তিতে ৩০ বছরে ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করবে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছয় সেট লিফট কিনতে ২০ কোটি ১৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। চায়নার এলজিইইআর এলিভেটর কোম্পানির ওয়েব থেকে জানা গেছে, তাদের বেড লিফটের দর ১১ হাজার থেকে ৫২ হাজার ২০০ ডলার। এখানে ৮৫ টাকা ডলার দর ধরে সর্বোচ্চ মূল্য হয় ৪৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। আবাসিক এই লিফটে ছয় থেকে ১০ জন প্যাসেঞ্জার উঠতে পারবে। প্যাসেঞ্জারের সার্বিক ওজন বহন ক্ষমতা সর্বোচ্চ এক হাজার কেজি। অথচ প্রকল্প প্রস্তাবে প্রতিটি লিফটের দাম ধরা হয়েছে তিন কোটি ৩৬ লাখ টাকার বেশি।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, আধুনিক সুবিধা দেয়ার জন্য সব ধরনের সুবিধা থাকবে ফ্ল্যাটে। একটি খেলার মাঠ ও পার্ক থাকবে। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবন ও কমিউনিটি সেন্টার, ১০টি কালভার্ট থাকবে। বিহারিদের হাঁটার জন্য সড়ক, ওয়াকওয়ে ও প্রধান ড্রেনগুলোও হবে উন্নত। আরো থাকবে প্রধান গেট, গার্ড রুম, অভ্যর্থনা কক্ষ, একটি সেতু, পরিদর্শন পিট নির্মাণ-৩৪টি ও পাঁচটি জেনারেটর।

প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্থাপত্য ড্রইং, কাঠামোগত ডিজাইন, পরামর্শক ও অন্যান্য ফি বাবদ খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণে প্রয়োজন হবে পাঁচ হাজার ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এখানে প্রতি একর জমির দর পড়ছে পাঁচ কোটি ৯৩ হাজার টাকা, যেখানে প্রথমপর্যায়ে ৬৪ একর জমির জন্য সাড়ে তিন কোটি টাকা করে একরপ্রতি দর ধরা হয়। এখন তা দেড় কোটি টাকার বেশি পড়ছে। ২০ তলাবিশিষ্ট পাঁচটি ভবন নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ১৯০ কোটি ৯২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। এখানে প্রতিটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩৮ কোটি ১৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে যাবে ১১ কোটি এক লাখ টাকার বেশি। খেলার মাঠ উন্নয়নে যাবে ৫০ লাখ টাকা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকার মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে বিহারিরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করতে এবং জেনেভা ক্যাম্পের জায়গায় সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। জেনেভা ক্যাম্পে সাড়ে ১৪ একর জমির ওপর প্রায় আট হাজার ৮০০ পরিবারের ৩৫ হাজার জন লোক বসবাস করে। প্রতিটি পরিবার ৪ বর্গ মিটারের একটি কক্ষে থাকা এবং খাওয়াসহ আনুষঙ্গিক পারিবারিক কাজকর্ম সম্পন্ন করে। তাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে মোহাম্মদপুর বসিলায় ৬৮ একর জমির ওপর ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ করার প্রস্তাব প্রথমে দেয়া হয়। পরে এখন সেটি এক হাজার একর জমিতে করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

জেনেভা ক্যাম্পের এই সাড়ে ১৪ একর জমির বাজারমূল্য হলো ২৬৩ কোটি টাকা। গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ এখানে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নির্মাণ করবে। আনুমানিক ৪০টি ভবন এখানে নির্মাণ করা সম্ভব হবে, যাতে দুই হাজার ২০০টি ফ্ল্যাট করা যাবে। এর মূল্য দাঁড়াবে দুই হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বসবাসরত বিহারিদের বসিলাতে স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সেখানে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রথমপর্যায়ে ২০ তলাবিশিষ্ট পাঁচটি ভবনে ১৫২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এটি সরকারের প্রথমপর্যায়ের পদক্ষেপ। সার্বিকভাবে ৫৮টি ভবনে মোট আট হাজার ৮০০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত থেকে লাখ লাখ মুসলমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরের সরকারি খাস জমিতে বসবাস শুরু করে। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন ওয়ার্কস, পাওয়ার ও ইরিগেশন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাউজিং উইং প্রতিষ্ঠা করে বিহারিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে ১১৬টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে, যার মধ্যে জেনেভা ক্যাম্প সর্ববৃহৎ। সম্প্রতি এই প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় গণভবন বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের নিরাপত্তার স্বার্থে জেনেভা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়াটা জরুরি।

ফ্ল্যাট বরাদ্দের পদ্ধতি প্রসঙ্গে তারা বলেন, ফ্ল্যাটগুলো নির্মাণ সময়ে আমরা একটা নীতিমালা প্রণয়ন প্রায় চূড়ান্ত করেছি। ৩০ বছরে মাসিক কিস্তিতে তাদেরকে ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তবে বিহারিদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের এমন উদ্যোগ দেশে এবারই প্রথম। প্রতিটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ২৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি। ফলে পাঁচটি ভবন নির্মাণ ব্যয় ১৪৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। আর প্রতি একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে সাড়ে তিন কোটি টাকা। তবে এখানে চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কারণ আবাসিক ভবনে চলন্ত সিঁড়ির কোনো প্রয়োজন নেই।