ঢাকা, আজ বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯

এক হাতে স্যালাইন, অন্য হাতে সেবায় ব্যস্ত তিনি

প্রকাশ: ২০১৯-০৫-০৯ ০৯:২০:১৫ || আপডেট: ২০১৯-০৫-০৯ ০৯:২০:১৫

নিজেই অসুস্থ চিকিৎসক। কিন্তু জরুরি রোগীর ভিড়। তাদের অনেকেই বৃদ্ধ, নারী ও শিশু। অনেকে ব্যাথায় কাতরাচ্ছেন। এ অবস্থায় আর বিশ্রামে থাকতে পারলেন না পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফ। নিজের অসুস্থ শরীরেই রোগী দেখা শুরু করেন তিনি।

নিজের এক হাতে স্যালাইন লাগিয়ে অন্য হাত দিয়ে রোগীদের সেবা দিতে শুরু করেন ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফ। অসুস্থ শরীরে রোগীকে সেবা দেয়ার ছবি নিমিষেই ভাইরাল হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হাতে স্যালাইন লাগিয়ে সেবা দেয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তার এসব ছবি শেয়ার করে প্রশংসা করেছেন।

এসব ছবি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। ছবিতে দেখা গেছে, ওই চিকিৎসকের পাশে স্ট্যান্ডে স্যালাইন ঝুলছে। ডাক্তারের সামনে বসে আছেন। নিজের অসুস্থ শরীরে স্যালাইন লাগিয়ে রোগী দেখছেন ওই চিকিৎসক।

এ চিত্র শুধু তেঁতুলিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না। এ চিত্র সারা বাংলাদেশের। যেন চিকিৎসক নয়, অসুস্থ হয়ে পড়েছে হাসপাতাল।

৩৬তম বিসিএসের মেডিকেল অফিসার ডা. কাজী আব্দুল্লাহ মারুফ। তিনি বাইরের হোটেলের খাবার খেয়ে ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ওই দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বৈকালিক দায়িত্ব থাকায় নিজের অসুস্থ শরীরে স্যালাইন লাগিয়ে রোগী দেখা শুরু করেন তিনি।

‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তেঁতুলিয়া,পঞ্চগড়’ ফেসবুক পেজে সোমবার ছবিগুলো শেয়ার করা হয়েছে।

পরে মঙ্গলবার এই ছবি শেয়ার করা হয়েছে ‘মেডিকেল নামক কারাগার থেকে বলছি’ নামের একটি ফেসবুক পেজে। ওই পেজ থেকে নিজের ফেসবুকে ছবিটি শেয়ার করেন শাইখ মাহবুব সেতু।

শাইখ মাহবুব সেতু ছবিটি তার ফেসবুকে ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘এ ধরনের ছবি হয়তো শুধুমাত্র বাংলাদেশেই সম্ভব। স্যালাইন ঝুলছে, ডাক্তার আর রোগী বসে আছে। ইনফিউশন সেটটি রোগীর হাতে নয় শেষ হয়েছে ডাক্তারের হাতে। বাহিরের হোটেলের খাবার খেয়ে ফুড পয়জনিং এর শিকার স্বয়ং ডাক্তার।

ছবিটা ৩৬ বিসিএসের মেডিকেল অফিসার ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফের বৈকালিক দায়িত্ব পালনের সময়কার। স্থান উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়।

অনেকে এই ডাক্তার সাহেবকে বাহবা দিলেও এটা আমাদের হেলথ সেক্টরের দৈন্যতার একটা চিত্র। এমন অসুস্থ অবস্থায় তাকে রিপ্লেস করার মতো অন্য কেউ এভেইলেবল নেই। অগত্যা এক হাতে স্যালাইন আর অন্য হাতে কলম।

ইউএইচএফপিও ছাড়া ১১ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। আছেন ৩ জন। একজন ফ্রাকচার হয়ে ছুটিতে, একজন আর এম ও এর দায়িত্বপালন করছেন। আরেকজন আমাদের এই বন্ধুটি।

সকালের ডিউটি বাদেও সপ্তাহে কমপক্ষে চারদিন ইমার্জেন্সি দায়িত্ব পালন করতে হয়৷ ইএমও এর কোনো পোস্ট অর্গানোগ্রামেই নেই। শিশু কন্সাল্টেন্ট একজন আছেন উনি আউটডোর পেশেন্ট দেখেন। সুইপারের সংখ্যা অপ্রতুল। রোগীর সিরিয়াল মেইনটেইনের মতো পর্যাপ্ত এমএলএসএস পর্যন্ত নেই। নিজেই টিকেট জমা নিয়ে নাম ডেকে ডেকে রোগী দেখতে হয়!

যখন উপজেলায় পোস্টেড ছিলাম তখন বাহিরে হোটেলে খেতে হতো। রোগীরস্বজনদের সঙ্গে দেখা হলে বলতো স্যার আপনারাও এখানে খান! আপনাদের বাবুর্চি নাই? হেসে বলতাম, থাকার জায়গারই ভাল বন্দোবস্ত নেই, বাবুর্চি তো বিলাসিতা।

ইউএইচএফপিওদের গাড়ি দেয়া হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে সেবার মান বাড়বে! কিন্তু যারা সরাসরি সেবা পৌঁছুবেন সেই মেডিকেল অফিসারদের খাবার ব্যবস্থাও নেই। রাস্তার পাশে ‘হোটেল আল ছালা দিয়া ঢাকা’ তে তিনবেলা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়! ২৪ ঘণ্টা যারা সার্ভিস দেয় তাদের খাবার ব্যবস্থা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন করবে না? তাদের কেন অলিগলির হোটেলে খেয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় অসুস্থ হতে হবে!

২ জন ডাক্তার যে ১১ জনের দায়িত্ব পালন করছেন এটার মূল্যায়ন কীভাবে হবে? কোনোভাবেই তো এর কম্পেন্সেশন দেয়া সম্ভবপর বলে মনে করি না। বেতনের সমপরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত দায়িত্বভাতা হিসেবে দিলেও না। ডাক্তাররা এত আশা নিয়ে সরকারি চাকরিতে এসেও কেন তথাকথিত গ্রামগুলোতে থাকতে চান না এ প্রশ্নের উত্তর দেবার কি আর দরকার আছে?’

টেলিফোনে কথা হয় হাতে স্যালাইন ঝুলিয়ে রোগী দেখা ওই চিকিৎসক ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালে খাবারের ব্যবস্থা নেই। তাই বাইরের খেতে হয় আমাদের। আর বাইরের খাবার খেয়ে তিনি ফুড পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। এতে অসুস্থ হয়ে পরায় অন্যান্য চিকিৎসকের পরামর্শে স্যালাইন নিয়েছিলাম। কিন্তু চিকিৎসক সংকট ও জরুরি বিভাগে রোগী থাকায় আমি বিশ্রামের সুযোগ পাইনি। এ জন্য স্যালাইন লাগিয়ে রোগী দেখতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, অন্যান্য চিকিৎসকরা আমাকে মানা করেছিল। তারা আমাকে বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন। কিন্তু জরুরি বিভাগে রোগী ছিল। মনে জোর থাকায় আমি হাতে স্যালাইন লাগিয়ে চিকিৎসা দিতে শুরু করেছিলাম। তবে তিনি নিজেকে অতটা ভাবেননি। ভেবেছিলেন রোগীর সেবা ও হাসপাতালের দৈন্যতার কথা।

অবশ্য ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফের কথায় বেশির নিজের বেশির অংশই ছিল হাসপাতালকে নিয়ে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার একমাত্র হাসপাতাল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সঙ্গত কারণেই এই হাসপাতালে রোগীর চাপ একটু বেশিই থাকে। কিন্তু এই হাসপাতালে ডাক্তারের পোস্ট ২৮ জন হলেও আছেন মাত্র চারজন।

ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফ বলেন, এই চারজন চিকিৎসকের মধ্যে একজন থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, যিনি প্রশাসনিক কাজ দেখেন। তার পক্ষে রোগীর সেবা দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর একজন কনসালটেন্ট। তিনি বহির্বিভাগে রোগী দেখেন। বাকি দুইজন দিয়ে চলছে জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডের রোগী দেখা। এজন্য আমাদের প্রত্যেককেই প্রায় ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, এটা শুধু তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নয়। এমন চিত্র বাংলাদেশের প্রায় সব উপজেলার।

৩৬তম বিসিএসের মেডিকেল অফিসার ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তিনি ছিলেন ওই কলেজের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই তার প্রথম কর্মস্থল। গত সেপ্টেম্বরে তিনি এই হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেছেন।

ডা. কাজী আবদুল্লাহ মারুফের বাড়ি ফরিদপুরের সদরেই। তার মা প্রফেসর শামসুন্নাহার। তিনি ফরিদপুরের সদরপুর সরকারি কলেজের প্রফেসর। বাবা মারা গেছেন ছোটবেলাতেই। তিনি ছিলেন চরভদ্রাশন সরকারি কলেজের প্রফেসর।